FANDOM



জয়জয়ন্তী (পথের দেবতা) Edit

কৌষিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পড়েছেন:1358 জন

'হরে মুরারে মধুকৈটভারে গোপাল গোবিন্দ: মুকুন্দ স্মরে কৃষ্ণ বিষ্ণু যজ্ঞেশ নারায়ণ নিরাশ্রয়াম মাম জগদীশোরক্ষঃ' (দশাবতার স্ত্রোত্র | গীতগোবিন্দ | কবি - জয়দেব)

[হে মুরদের শাষক! হে মধু কৈটভের বিনাশকারী! হে হরি! ওগো পশুপালক ঈশ্বর! হে মুকুন্দ, তোমাকে আমরা স্মরণ করি | হে কৃষ্ণরূপ বিষ্ণু তুমি তো সকল যজ্ঞের অধিপতি নারায়ণ! ওগো জগদীশ্বর আমার মতন আশ্রয়হীনকে তুমি রক্ষা কর!]

সেদিন ঘুম ভাঙল ঝড়ের দাপটে, চোখ ধাঁধানো প্রলয় বিদ্যুৎ-এ | বন্ধ কাঁচের গায়ে আছড়ে পড়ছে শুকনো পাতা, ছিন্ন লতা,আধফোটা ফুলকুঁড়ি, ভাঙা গাছের ডাল | গতকাল সন্ধেবেলা আগুন জ্বালানো হয়েছিল উঠোনে, উড়ে আসছে ছাই ও পোড়া কাঠকার্বন | ঘুম ভেঙেছে বটে কিন্তু সম্বিত ফিরে পেতে তখনও বাকি | হতভম্বের মতো উঠে বসি বিছানায় | নিরন্ধ্র অন্ধকারের ঘন ক্কাথ থিতিয়ে পড়েছে চাদরে বালিশে | আধো অনচ্ছ দেওয়াল জোড়া কাচের গায়ে নাক ঠেকাই | বাইরে ধূসর পৃথিবী | মরা আকাশের আলো | ধুলোঘূর্ণি | তবে কি ভোর এখনও আসেনি? প্রলয় এসেছে! ঠিক সে মুহূর্তে কাঁচ দেওয়ালের ওপাশে অতর্কিতে আবির্ভাব হয় ফুট ৫ লম্বা -- প্রকাণ্ড মুরগির পা লাগানো -- পালকবিহীন -- প্রাগৈতিহাসিক এক দানব পাখির | পিছু পিছু এসে দাঁড়ায় সম্পূর্ণ একটি গড়ুর ফৌজ | রাক্ষুসে ঠোঁটের ফলার বারবার অধীর আঘাতে ওরা নস্যাৎ করে ফেলতে চায় পলকা কাঁচের ব্যবধান | ক্রমে আঘাত আরও দ্রুত হতে শুরু করে | আমি প্রমাদ গুনি | চিৎকার করে উঠি তুমুল মৃত্যুভয়ে!

'চুল্লীর পাশের টেবিল'

শীতে কাতর সকাল ৯টা | কাঠচুল্লীর ধার ঘেঁষে বসে আছি | সামনে আগুন এবং আগুনের মালিক আহ্লাদ বেহুরা, পাচক -- ডারিংবাড়ি ইকো ট্যুরিসম কেন্দ্র | বাইরে এখনও ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে,যদিও বহুক্ষণ ঝড় থেমে গেছে | রান্নাঘরের জানলা দিয়ে যতদূর চোখ যায় জঙ্গলাকীর্ণ ঘন সবুজ স্তেপ আর তার ওপর বিছানো মায়া-কুয়াশার চাদর | একেক জায়গায় বড়সড়ো গাছের গুঁড়িকে ঘিরে কুয়াশা জমাট বেঁধেছে, যেন মেঘ! বড় গাছ বলতে পাইন, শাল,মহুল আর আম | না আমবাগান নয়, আমগাছের জঙ্গল ! কুসি আম ঘাসে পড়ে আছে | নয়ানজুলিতে খসে পড়া গাছ পাকা আম অবহেলায় পচছে | এই প্রেক্ষাপট থেকে সামান্য দূরে হলুদের বন,কফি বাগিচা আর লতানো গোলমরিচের উপবন | তার থেকে আর একটু বেশি দূরে লুটিয়ে পরে আছে গেঁয়ো ডলুরি নদী, তাতে স্রোত বেশি গভীরতা মামুলি | পূর্বঘাট আর মালকানগিরির উপত্যকায় এই হল ডারিংবাড়ি! ওড়িশার কাশ্মীর | ২০১০-এর জানুয়ারি মাসে এখানে শেষ বরফ পড়েছে | জেলা কন্ধমাল |

ততক্ষণে শ্রীযুক্ত আহ্লাদের মুখে জেনে গেছি গত রাতের বিভীষিকাময় গড়ুর রহস্যের সমাধান | এই অতিথি নিবাস থেকে আধমাইলটাক দূরে শক্ত ইস্পাতের তারজালি দিয়ে ঘেরা খামারে এম্যু পাখির আবাদ | প্রগৈতিহাসিক হিংস্র এম্যু এখানে নিতান্তই দ্রুতপ্রজননশীল মাংসপাখি | তবু ঝড় আর বিদ্যুৎ চমকের রাতে বৃষ্টি নামার মুহূর্তে রাক্ষুসে ঠোঁটের কামড়ে ওরা কেটে ফেলেছিল ইস্পাতের তারজাল, ঘেরাটোপ | তারপর বেরিয়ে পড়েছিল নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে | সে কত সহস্র শতাব্দী আগে এমনই এক তুফানের রাতে ওদেরই কোনও পূর্বপুরুষ হয়ত খুঁজে ফিরেছিল নিরাপদ ডাঙা-মাটি-ঘাস | তারপর প্রলয় পয়োধিজলে বিলুপ্ত হয়েছিল বনতট | হয়ত সেই স্মৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ওরা বহন করে চলেছে ওদের রক্তে,মস্তিষ্কের গুহায়, জিনের ভেতরে, প্রোটিনের ভাঁজে | জল -- মাটি -- আকাশ -- হাওয়া -- আগুন -- বিদ্যুতময় এই প্রকৃতির আদিম চোরাটান ওরা তাই আজও টের পায় | গত রাতে তেমনই কোনও বিপদসংকেত আগাম বুঝতে পেরেছিল |

'বিপদ সংকেত'

বৃষ্টি থেমেছে তাই এত শীত | উনুনে, চায়ের কেটলিতে ফুট ধরেছে,বুদ্বুদ উঠছে | এই কনকনে শীতে এক পেয়ালা ধোঁয়াওঠা চা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পানীয়গুলোর অন্যতম |

কিন্তু বাইরের ওই দিগন্তব্যাপী সবুজের ওপর সাদা কুয়াশার আস্তরণ আরও রহস্যময় | সুতরাং আহ্লাদ বেহুরার প্রতিশ্রুত গরম মালাই চায়ের পিছুটান কাটিয়ে ফেলাই বুদ্ধিমানের কর্তব্য | রিপু আর রিপুমুক্তির মধ্যবর্তী ধূসর দোলাচলের মুহূর্তে হৈ হৈ এসে হাজির হয় কেয়ারটেকার চক্র দেহুরী | তার মুখে মর্মান্তিক ব্রেকিং নিউজ :বনপার্টি আর সবুজ পার্টির মধ্যে গুলির লড়াই শুরু হয়েছে ডারিংবাড়ি বাজারে !

'যুদ্ধ পরিস্থিতি'

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ট্যুরিস্ট সেন্টারের লোহার মূল ফটক বা লোহার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে | দরজার বাইরের রাস্তা ধরে মিনিট তিনেক হাঁটলেই ডারিংবাড়ি বাজার | ভিতরে কাঁটাতার আর প্রকাণ্ড পাইন গাছের সারি দিয়ে ঘেরা ৯-১০ বর্গকিলোমিটার জোড়া ডারিংবাড়ি ইকো ট্যুরিজম সেন্টার ও ট্যুরিস্ট ক্যাম্পের চৌহদ্দি | চোখে পড়ে সাইনবোর্ড, ইন্টিগ্রেটেড অর্গানিক ফার্মিং, দুফুট লম্বা ফলবতী পেঁপে গাছের পাশে প্রকাণ্ড জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বাঁধাকপির হাস্যকর কেতাবি ফসল বৈচিত্র্য | সরকারি বাঁধানো চাতাল ও পরিবেশ সচেতন ১০০ দিনের কাজের বরাভয় | ডাঁই করা এম্যু পাখির বিষ্ঠা ও গোবরের স্তুপের পাশে ঝুড়ি ও কোদাল হাতে কন্ধ নারীপুরুষ | গাঢ় খয়েরি রঙের শরীর | মেয়েদের নাকে কানে ভারি রূপোর বালা -- ওই ওদের পারিবারিক নিশান | সারা মুখে পিঠে আর শরীরের খোলা অংশে নীল উল্কি | যাদের চুলে রঙবেরঙের কেশসজ্জা তারাই কেবলমাত্র কুমারী | ওরা ডোঙ্গারিয়া কন্ধ,কন্ধমালের ভূমিপুত্র ও কন্যা | অন্যান্যদিন কাজের তালে তালে ওরা নিজস্ব সুরে মন ভিজিয়ে নেয় | আজ মুখে কুলুপ, চোখে আশঙ্কার ছায়া পড়েছে | গোলাগুলির বিপদ সংকেত সম্ভবত ওরা আগেই জেনে গেছে |

'পর্বতের দেবতা নিয়ামগিরি'

পৃথিবীর আদি পিতা আর মাতা পর্বতের দেবতা নিয়াম পেনু আর মাটির দেবতা ধরনী পেনুর কাছ থেকে কুয়াশাময় এই অরণ্যপাহাড়ের দুনিয়াদারির অধিকার পেয়েছিল কন্ধরা | হাজার হাজার বছর ধরে নিয়ামগিরি-কে পিতা আর ঈশ্বর বলেই জেনে এসেছে ভারতবর্ষের প্রাচীনতম এই জনগোষ্ঠী | মায়ের কোলে শুয়ে একজন কন্ধ শিশু যে ভাষায় প্রথম কথা বলতে শেখে তার নাম'ক্যুই'| দ্রাবিড় ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত কন্ধদের মাতৃভাষাটি আজকাল লেখা হয় ওড়িয়া লিপিতে | ক্যুই ভাষায় লিখিত কন্ধদের পুরাণ পুঁথি | তাতে আছে নিয়ামরাজার নির্দেশ, মন্ত্র, ডোঙারিয়া (ডোঙার =পাহাড়) প্রকৃতি রাজ্যের আইন, চাষবাসের পদ্ধতি, গাছগাছালি পশুপাখিদের জগত সম্পর্কে জ্ঞান, আবহাওয়া বিজ্ঞান,শিকড়বাকড় আর ওষধির হালহদিস | আছে এমনকী সৃষ্টি রহস্য আর সৌন্দর্য তত্ত্ব এবং শিল্প জিজ্ঞাসা | জেনে রাখুন, কন্ধদের সমাজ - সভ্যতা বেদ উপনিষদের থেকে অনেক পুরনো | 

আয়ুর্বেদের জন্মের অনেক আগে থেকেই নিয়ামগিরি পাহাড়ের ঢালে কন্ধরা চাষ করত এক আশ্চর্য শস্য | এক বিশেষ প্রজাতির ধান | সেই ধান ঢেঁকিতে ভেঙে পাওয়া যায় ওষধি চাল -- যা একাধারে ওষুধ ও পথ্য | হালে অবশ্য নিয়ামগিরির ওষুধচালের বদলে কন্ধরা ইউনিসেফের স্বাস্থ্য প্রকল্পে বেশি নির্ভর করতে শিখেছে | কেননা, এই তো কয়েক দশক মাত্র আগে নিয়ামগিরির ওষুধ চালের পেটেন্ট কিনে নিয়ে গেল সুদূর আমেরিকার এক বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি,দিল্লির ভারত সরকারের কাছ থেকে !

'দো বিঘা জমিন'

ইতিমধ্যে কয়েক বছর আগে একদিন বারিক (কন্ধ সমাজের সাংবাদিক) এসে জানান দিল দিল্লির রাজা কন্ধদের কাছে নিয়ামগিরি আর ধরণী পেনুকে চেয়ে পাঠিয়েছে | বস্তুত কলিঙ্গঘাটের এই পর্বতময় অরণ্যভূমির গর্ভে আছে বক্সাইট, চুনাপাথর, সীসা, দস্তা,গ্রাফাইট, কোয়ার্টজ সমেত হাজারো খনিজের এক আলিবাবার গুপ্তভান্ডার | আছে নদী ভরা জল | আর আছেন কঠোর পরিশ্রমী কন্ধরা, যারা আসলে এতই ভদ্র যে যুগের পর যুগ ধরে হিন্দু(বৈদিক) - শক-হূণ-পাঠান-মোঘল-বাইবেল হাতে ইংরেজ-হনুমান চালিসা হাতে হিন্দিভাষী নব্যহিন্দু যে যেভাবে চেয়েছে, অকাতরে বেগার খেটে গিয়েছেন | সুতরাং কারখানা তৈরির জন্য এমন উপযুক্ত পরিবেশ আর কোথায় বা মিলবে ? এবং একথা তো দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে এই বিপুল পরিমান খনিজ সম্পদ ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক বিকাশকে গতিশীল করে তুলতে, জিডিপি রাতারাতি বাড়িয়ে তুলতে একান্ত দরকার | সুতরাং কন্ধমাল,কালাহান্ডি, কোলাপুট, গ্যাঞ্জাম, মালকানগিরির জঙ্গলে কন্ধদের হাত পা ছড়িয়ে থাকতে দেওয়াটা এখন হয়ে দাঁড়াল একটা বিলাসিতা | কাজে কাজেই নিয়ামরাজার সন্তান সন্ততিদের উচ্ছেদ তো করতেই হবে নিয়ামগিরি থেকে | ব্যাপারটা যতটা নির্মম শোনাচ্ছে ততটা নির্মম আসলে নয় | কেননা প্রস্তাবিত খনি, কারখানা তৈরির জন্য মাটিকাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তো ভূমিপুত্ররাই পাবে | কুলি লাইনে তাদের জন্য পাকা কংক্রিটের ছাদওয়ালা স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা যুক্ত বসতি তৈরির ডিজাইনও তৈরি | এছাড়াও বুদ্ধিমান রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার বছরে অন্তত ১০০ দিন শ্রমের বিনিময়ে নিশ্চিত রোজগারের ঢালাও বরাদ্দ করেছেন পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু কন্ধ সম্প্রদায়ের জন্য | ওদের পুনর্বাসন প্যাকেজ নিয়ে কতবার যে দফায় দফায় দিল্লিতে বৈঠকে বসলেন দেশের সাংসদরা | পক্ষে বিপক্ষে ভোট পড়ল কতই না | 

'ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার পক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদ'

এত কিছু সত্ত্বেও বেঁকে বসল সেই কন্ধরা, যাদের কিনা নিজস্ব একটা ভাষা আছে, আছে দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্প আর হাজার হাজার বছরের ইতিহাস | প্রতিবেশী তেলেগু রাজ্য থেকে এল বনপার্টির মুরুব্বিরা | বলল, জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে যুদ্ধ করতে হবে | বলল, আমরা তোমাদের শেখাবো কি করে যুদ্ধ করতে হয় | অন্ধ্র-ওড়িশা বর্ডার কমিটি, ওড়িশা স্টেট কমিটি, মালকানগিরির কমিটি ... কমিটিতে কমিটিতে ছেয়ে গেল নিয়ামগিরি | তখন বনপার্টির সঙ্গে যুদ্ধ করতে দিল্লি সরকার সবুজ পার্টিকে পাঠাল | তাদের গায়ে জংলা ছাপ ক্যামোফ্লেজ পোশাক | হাতে প্রকান্ড শক্তিশালী বারুদঠাসা চকচকে বন্দুক | এরপর একদিন সকালে বনপার্টির লোকেরা একফাঁকে লুকিয়ে এসে ঘরে ঘরে ডাক দিয়ে হাট্টাকাট্টা মরদরা আর সোমত্ত কুমারীদের নিয়ে আরও ঘন জঙ্গলের দিকে চলে গেল | বলে গেল বন্দুক চালানো শেখাতে নিয়ে যাচ্ছে | বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে গেল তবু ওরা আর সেদিন বাড়ি ফিরল না | 

'সময় ফুরায় আর সকলই ফুরায় আর সামান্যই থাকে  দুচার বসন্ত আমি ঘোরালাম সামান্য লেখাকে,

'আজ হোক বা কাল নিয়ামগিরি থেকে কন্ধদের বাস হয়তো উঠে যাবে |' ( - চলনসই হিন্দিতে বলছিল কেয়ারটেকার চক্র বেহুরী | ২৫ বছর বয়সী চক্র বেহুরীর বাড়ি কালাহান্ডি জেলায় | জাতে 'রাজ-কন্ধ' | ওর গানের গলাটি সুরেলা |) চক্র বেহুরী : 'তখন হয়তো আমাদের ক্যুই ভাষায় কথা বলার আর দরকারই পড়বে না |' (বলতে বলতে একসময় একদম চুপ করে যায় ও | )

শুনতে শুনতে একটা পঙ্কিল ইঙ্গিত খেলা করে যায় আমারও মাথার ভিতর | আজ কন্ধ জনগোষ্ঠী আর তাদের ক্যুই ভাষার যা পরিনতি আরও দশ-বিশ-একশো বছর পরে বাংলা আর বাংলাভাষীরও সেই একই পরিণতি হবে না তো ? আমি উঠে পড়ি | হাঁটা লাগাই ট্যুরিস্ট ক্যাম্পের দিকে | 

'মেঘে মেঘে অন্ধ অসীম আকাশ'

এক নিরূপায় আলস্যে ট্যুরিস্ট লজের বিছানার উপুড় শুয়ে আছি | অন্যমনস্ক হাতে চালু হয়ে যায় বৈদ্যুতিন গানের বোতাম | বেজে ওঠে আজ সকালের প্রথম কোমল নিষাদ | এবং নজরুল রচিত | 'মেঘে মেঘে অন্ধ অসীম আকাশ |' কন্ঠটি 'বাংলা খেয়ালের পায়োনিয়ার'জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীর | রাগ 'জয়জয়ন্তী' | ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের প্রধান রাগগুলোর মধ্যে জয়জয়ন্তীর হদিশ নেই | রাগ বিলাবল আর রাগিনী 'সোরাঠ' ('মেঘ' রাগের অন্তর্বর্তিনী)-এর মিলনে'জয়জয়ন্তী'-র জন্ম | এমনটাই বর্ণনা আছে গুরু গ্রন্থসাহেবের'রাগমালায়'!

'রাগমালা'

গুরু গ্রন্থসাহেবের নাম শুনে কপাল কুঁচকোবেন না | এই পবিত্র গ্রন্থের সর্বশেষ পরিশিষ্টটির নাম 'রাগমালা' | তাতে ১২টি শ্লোক ও ৬০টি পংক্তিতে আদি গুরুমুখী ভাষা-লিপিতে সঙ্কলিত হয়েছে রাগ-রাগিনীর গড়ন্-মেজাজ-চলন ও ব্যাকরণ | গ্রন্থ সাহেবের প্রতিটি স্তোত্র বা পদ(গুরুবানী) সুর যোগ করে ভজন আকারে ভক্তের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়াই রেওয়াজ | যে পদ বা স্তোত্রের আত্মা বা মর্মার্থ যেমন, তার বাহক রাগ বা রাগিনীটির তেমনই সুপ্রযুক্ত | এ প্রসঙ্গে জানা থাক,'রাগমালা' অনুযায়ী মূল বা প্রধান রাগের সংখ্যা ৬ | প্রতিটি রাগ-এর ৫ জন স্ত্রী (রাগিনী) আর ৮টি করে পুত্রসন্তান (নতুন রাগ)আছেন | অর্থাৎ মোট রাগিনীর সংখ্যা ৩০ | নতুন রাগ ৪৮টি | রাগ 'জয়জয়ন্তী' রাগমালায় বর্ণিত এই মূল রাগ-রাগিনী নতুন রাগের তালিকার বাইরে | যদিও 'জয়জয়ন্তী'-র স্রষ্টা নবম শিখ গুরু তেগ বাহাদুর (১৬২১-১৬৭৫)|

'জয়জয়ন্তী'

গ্রীষ্ম রাতের প্রথম প্রহর (রাত ৮টা থেকে ১০টা) জয়জয়ন্তী গাইবার পক্ষে প্রশস্ত | বলছেন, স্বয়ং গুরু তেগ বাহাদুর | আরও জানা যাচ্ছে গ্রন্থ সাহেবের দুটি মাত্র স্তোত্রে সুর দেওয়ার জন্য এই নতুন রাগটি সৃষ্টি করার দরকার পড়েছিল গুরুজির | সেই দুটি স্তোত্রের মর্মবাণীটি কি ? সে হল এক আত্মা, যার সব সংশয় এই মাত্র খসে পড়ল | শরীরি মোহের হাঁসফাঁস থেকে মুক্ত হয়ে এবার সে আনন্দের সঙ্গে মিলিত হতে যাবে | মোহের সঙ্গে যুদ্ধে সদ্য বিজয়ী সেই আত্মার জয়যাত্রার সুর জয়জয়ন্তী | আরোহ - রে গা (কোমল)রে সা রে গা (শুদ্ধ,) মা পা ধা পা নি সা অবরোহ - সা নি(কোমল) ধা পা ধা মা গা (শুদ্ধ) রে গা (কোমল) রে সা কোমল নিষাদ আর কোমল ও শুদ্ধ গান্ধারের পর্যায়ক্রমিক ব্যবহারে প্রাচীন এই রাগটির চলনে বিসৃষ্ট হয়েছে অবরোধহীন এক অসীম সম্ভাবনা | যেমন, মহীয়ান আকাশে মেঘের মহাভারত | যেমন, জয়গাথার গৌরব | 

পূর্বঘাটের পাড়চূড়োয় এক ধূসর মরা আকাশের আলোর নীচে দাঁড়িয়ে সম্ভাবনাহীন এক সকালে জয়জয়ন্তীর সেই গৌরব আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল, ঠিক যেমন জাতীয় সঙ্গীত শুনলে আমাদের গলা কখনও কখনও বুজে আসে বাষ্পোচ্ছ্বাসে ! চোখ বুজে আমি মনে করছিলাম চক্র দেহুরীর গর্বিত চিবুক আর মুখভঙ্গী | উনি ভারতবর্ষের এক প্রাচীনতম জনগোষ্ঠীর (কন্ধ) তরুন এক প্রতিনিধি | ওদের এমনকী নিজস্ব একটা ধর্ম, ভাষা ও লিপি পর্যন্ত আছে | তবুও ওরা পিছিয়ে পড়া এবং সংখ্যালঘু !

'ওখানে তুমি সংখ্যালঘু'

চিয়াপাস | মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রের ৩১টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে একটি | মায়া সভ্যতার পীঠস্থান | ঘন পাহাড়ি অরণ্যরাজ্য (রেনফরেস্ট) | পূর্বে গুয়াতেমালা ও দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগর | মায়া সভ্যতার উত্তরসূরী অরণ্যচারী আদিবাসীদের নিভৃত বাসভূমি | গত শতাব্দীর ৯০-এর দশক থেকে কর্পোরেট চালিত মিলিটারি ও প্যারামিলিটারি বলে বলীয়ান মেক্সিকোর রাষ্ট্রশক্তির চিয়াপাসের ঘন রেনফরেস্ট নির্বিচারে কেটে সাফ করে জমি হাসিল করতে শুরু করে | কফি চাষ আর বিলাসবহুল রিসর্ট তৈরি করে বিদেশী মুদ্রা উপার্জনের জন্য | চিয়াপাসের বনজ ও খনিজ সম্পদ -- যা কলম্বাসের সময় থেকেই ছিল স্পেনীয় ঔপনিবেশিকতার লালসার ধন -- এখন মেক্সিকোর স্বাধীন রাষ্ট্রশক্তি তা প্রায় লুন্ঠন করতে থাকে নির্মমভাবে, জেট গতিতে | ভূমিপুত্র মায়া আদিবাসীরা নতুন করে উদ্বাস্তু হতে শুরু করেন | ১৯৯৪ সালে এর বিরুদ্ধে ঘনিয়ে ওঠে জাপাতিস্তা আন্দোলন | বিপ্লবী নেতা মারকোস হলেন জাপাতিস্তা আন্দোলনের মুখপাত্র | মাঠে ময়দানে আর প্রচারে প্রতিরোধ আন্দোলন যখন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে, মেক্সিকো সরকার মারকোসের নামে দেগে দেয় অসামাজিকতার অপবাদ | প্রচার করা হয়, সাবকম্যানডান্ট মারকোস আসলে সমকামী |

মারকোস তার জবাবে লিখে ফেলেন অনতিদীর্ঘ আস্ত একটি কবিতা 

''Yes, Marcos is gay.  Marcos is gay in San Francisco, Black in South Africa  An Asian in Europe,  A Chicano in San Ysidro, An anarchist in Spain,  A Palestinian in Israel,  A Jew in Germany,  A Gypsy in Poland,  A single woman on the Metro at 10 pm,  A peasant without land,  A gang member in the slums,  An unemployed worker,  An unhappy student and,  of course,  A Zapatista in the mountains.  Marcos is all the exploited, marginalised, oppressed  minorities resisting and saying 'Enough'. He is every minority who is now beginning to  speak -- this is Marcos.''

{http://www.banglalive.com/Feature/Detail/8414/daringbari-kandhas-are-pushed-to-the-wall-getting-marginalised-and-the-deity-of-the-road-keeps-on-singing-the-raga-jayjayanti#.U-Zi2_mSxn4}

Community content is available under CC-BY-SA unless otherwise noted.